রাজশাহী মহানগর গোয়েন্দা শাখার এসআই ফরহাদুজ্জামানের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষকে হয়রানির অভিযোগ

রমজান আলী  :: উত্তরবঙ্গ প্রতিদিন – ​ভোর পাঁচটা। চারপাশের অন্ধকার কেটে তখনো দিনের আলো ফোটেনি। সারা দিনের হাড়ভাঙা খাটুনির প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন দামকুড়া থানার মুরারীপুর এলাকার সাধারণ কৃষক বাটুল আলী ও তাঁর দিনমজুর বড় ছেলে হিরা। কিন্তু ফসলের মাঠে যাওয়ার বদলে সেদিন তাঁদের ভোর শুরু হলো এক চরম দুঃস্বপ্ন দিয়ে। রক্ষক হয়ে যাদের জনগণের জানমালের নিরাপত্তা দেওয়ার কথা, সেই পুলিশেরই কিছু অসাধু সদস্যের হাতে নিজ ঘরেই জিম্মি হতে হলো খেটে খাওয়া এই পিতা-পুত্রকে। 

 

রাজশাহী মহানগর ডিবির (ডিবি) এসআই ফরহাদুজ্জামান ভূঁইয়া ও তাঁর দলের বিরুদ্ধে ওঠা এই নিষ্ঠুর হয়রানির অভিযোগ আজ পুরো এলাকায় ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। ​অথচ পুলিশের শীর্ষ পর্যায়ের চিত্রটি সম্পূর্ণ ভিন্ন। বাংলাদেশ পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মোঃ আলী হোসেন ফকির দেশ থেকে সন্ত্রাস, মাদক, চাঁদাবাজি ও কিশোর গ্যাং নির্মূল করতে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি ঘোষণা করেছেন। সেই নির্দেশনা বাস্তবায়নে রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশের (আরএমপি) কমিশনার মোহাম্মদ ফয়েজুল কবিরও একটি নিরাপদ ও অপরাধমুক্ত রাজশাহী গড়তে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। তাঁর দিক নির্দেশনায় আরএমপির নিয়মিত বিশেষ অভিযান এবং বিশেষায়িত সিআরটি (CRT) টিমের সাহসিকতায় যখন মাদক ও সন্ত্রাস দমনে নতুন আশার সঞ্চার হয়েছে, ঠিক তখনই সর্ষের ভেতরে থাকা কিছু ভূতের কারণে পুলিশের সেই সুনাম আজ প্রশ্নবিদ্ধ হতে চলেছে। অভিযানের আড়ালে একশ্রেণির অসাধু সদস্য মাদক ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে মাসোহারা আদায় থেকে শুরু করে নিরীহ মানুষদের জিম্মি করে অর্থ আদায়ের নেশায় মেতে উঠেছে।

 

​ঘটনার সূত্রপাত গত ১৪ই অক্টোবর ভোররাতে। মাদক অভিযানের নাম করে কৃষক বাটুল আলীর বাড়িতে জোরপূর্বক প্রবেশ করেন এসআই ফরহাদুজ্জামান ভূঁইয়া ও তাঁর দল। ঘরে ঢুকেই কোনো পরোয়ানা বা সুনির্দিষ্ট প্রমাণ ছাড়া বাটুল আলী ও তাঁর দিনমজুর ছেলে হিরাকে জিম্মি করে ফেলা হয়। তল্লাশির নামে একটি দরিদ্র পরিবারের তিল তিল করে গড়ে তোলা সংসার তছনছ করে চালানো হয় এক নজিরবিহীন তাণ্ডব। পুরো বাড়ি তন্নতন্ন করে খুঁজেও যখন মাদকের লেশমাত্র পাওয়া গেল না, তখন বেরিয়ে আসে অভিযানের আসল রূপ। নিরীহ পিতা-পুত্রের দিকে তাক করে সরাসরি দাবি করা হয় ৫০ হাজার টাকা! স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেওয়া হয় নগদ ৫০ হাজার টাকা না দিলে খালি হাতেই ধরে নিয়ে গিয়ে মিথ্যা মাদক মামলায় ফাঁসিয়ে চালান করে দেওয়া হবে।

 

​দিনমজুর ও কৃষক পরিবারের কাছে ৫০ হাজার টাকা যেন আকাশছোঁয়া অংক। নিরুপায় ও অসহায় কৃষক বাটুল আলীর আর্তচিৎকারে তখন ভোরের নীরবতা ভেঙে প্রতিবেশীরা ছুটে আসেন। চোখের সামনে একজন নিরপরাধ মানুষকে এভাবে ফাঁসানোর চেষ্টা দেখে ফুঁসে ওঠে পুরো গ্রামবাসী। এলাকাবাসীর তীব্র প্রতিবাদ ও বাধার মুখে একপ্রকার বাধ্য হয়েই পিছু হটতে হয় এসআই ফরহাদুজ্জামান ও তাঁর দলকে। তবে যাওয়ার আগে তাঁরা বাটুল আলী ও তাঁর ছেলেকে পরবর্তীতে ‘দেখে নেওয়ার’ প্রকাশ্য হুমকি দিয়ে যান।

 

​আজ নিজ বাড়িতেই চরম নিরাপত্তাহীনতা ও আতঙ্কে দিন কাটছে ওই কৃষক পরিবারের। কান্নাজড়িত কণ্ঠে কৃষক বাটুল আলী বলেন, “আমি অতি সাধারণ ও নিরীহ একজন মানুষ, মাথার ঘাম পায়ে ফেলে চাষবাস করে সংসার চালাই। আমি বা আমার পরিবার তো দূরের কথা, আমার চৌদ্দ পুরুষের কেউ কখনো মাদকের সাথে জড়িত ছিল না। বিনা কারণে ডিবি পুলিশ আমাদের ওপর এই নির্যাতন চালিয়েছে এবং দেখে নেওয়ার হুমকি দিয়ে গেছে। আমরা এখন প্রতি মুহূর্তে ভয়ের মধ্যে আছি। আমি এই অন্যায়ের বিচার চাই, আমার পরিবারের নিরাপত্তা চাই।”

 

​ঘটনাটি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরাও। এলাকার প্রবীণ বাসিন্দা মাইন সরকার বলেন, “জন্মসূত্রেই আমরা এই এলাকার মানুষ। ছোটবেলা থেকে বাটুল ও তাঁর পরিবারকে দেখে আসছি, তারা অত্যন্ত সহজ-সরল ও সৎ মানুষ। তাদের সাথে মাদকের সম্পৃক্ততার প্রশ্নই ওঠে না। ৫ই আগস্ট-পরবর্তী নতুন বাংলাদেশে ডিবি পুলিশের এমন স্বৈরাচারী আচরণ কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। আমরা চাই নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে ওই অভিযুক্ত ডিবি অফিসারের বিরুদ্ধে দ্রুত কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হোক।”

 

​শুধু নিরীহ কৃষক পরিবারই নয়, এসআই ফরহাদুজ্জামান ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে বিভিন্ন অজুহাতে স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মীদের বাড়িতে ঢুকে তল্লাশি ও হয়রানি করারও একাধিক অভিযোগ রয়েছে। আর এখানেই জনমনে বড় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

 

কে এই এসআই ফরহাদুজ্জামান ভূঁইয়া?

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দলীয় সুপারিশে ২০১৪ সালের ৩৪তম ব্যাচে সাব-ইন্সপেক্টর (এসআই) হিসেবে নিয়োগ পান তিনি। ওই বছর সারদা পুলিশ একাডেমিতে প্রশিক্ষণ শেষে নভেম্বর মাসে সমাপনী কুচকাওয়াজের মাধ্যমে চাকরিতে যোগ দেন। গত ১২ বছর ধরে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ থানায় থেকে বিগত সরকারের রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন এই কর্মকর্তা।

 

​পটপরিবর্তনের পরও বিগত আমলের এমন একজন বিতর্কিত ও রাজনৈতিক মদদপুষ্ট কর্মকর্তাকে কীভাবে রাজশাহী মহানগর ডিবির মতো একটি স্পর্শকাতর ও গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় দায়িত্ব দেওয়া হলো, তা নিয়ে আজ সচেতন মহলে তীব্র প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে। সাধারণ মানুষের দাবি,পুলিশ কমিশনারের সদিচ্ছা ও আরএমপির ভাবমূর্তি অক্ষুণ্ণ রাখতে অবিলম্বে এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত হোক এবং পোশাকের আড়ালে থাকা এমন চাঁদাবাজ ও নিপীড়কদের আইনের আওতায় আনা হোক।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *