ফুলে ফুলে সিক্ত এমপি বাদশা

উত্তরবঙ্গ প্রতিদিনের সংবাদটি শেয়ার করুন

নিজস্ব প্রতিবেদক, রাজশাহী ::  রাজনীতির ৫০ বছর পূর্তিতে রাজশাহীতে হাজারো মানুষের ভালোবাসায় সিক্ত হয়েছেন বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক বীর মুক্তিযোদ্ধা ফজলে হোসেন বাদশা এমপি। শনিবার বিকাল ৩টায় তাকে নাগরিক সংবর্ধনা দেওয়ার জন্য জেলা শিল্পকলা একাডেমি মিলনায়তনে বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানস্থলে বাদশা উপস্থিত হলে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর নারীরা তাকে সাংস্কৃতিক নৃত্য পরিবেশনের মাধ্যমে স্বাগত জানান। 

 

 

পরে রাজশাহীর শতাধিক স্কুল-কলেজ, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনসহ গণমাধ্যমকর্মীরা ফজলে হোসেন বাদশাকে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানান। এসময় রাজশাহীর বিশিষ্টজনরা বাদশার সুদীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের স্মৃতিচারণ করে বক্তব্য রাখেন। অধ্যাপক সনৎ কুমার সাহা বলেন, ফজলে হোসেন বাদশা আমার ছাত্র ছিলেন। নিজের ছাত্র যখন ভবিষ্যতে গিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়, দেশের নাম উজ্জ্বল করে; তখন শিক্ষক হিসেবে তা অত্যন্ত গর্বের। আমি বাদশাকে নিয়ে গর্ব করি। একই ধারায় টানা পঞ্চাশ বছর রাজনীতিতে সক্রিয়তা শক্তিশালী চেতনা ও আদর্শের পরিচয় বহন করে। ফজলে হোসেন বাদশা কখনোই তার আদর্শ থেকে তিল পরিমাণ বিচ্যুতি হননি। তার একনিষ্ঠ দেশপ্রেম ও সুদীর্ঘ রাজনৈতিক জীবন ভবিষ্যত তরুণ প্রজন্মের অনন্য অনুপ্রেরণা ।

 

রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান নুরুল আলম বলেন, রাজশাহীর প্রতিটি প্রগতিশীল আন্দোলন-সংগ্রামে ফজলে হোসেন বাদশা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। শুধু রাজনীতিই নয়, রাজশাহীকে শিক্ষা নগরীতে পরিণত করতেও তার অবদান স্মরণীয়। যতদিন রাজশাহী থাকবে ততদিন ফজলে হোসেন বাদশাকে সাধারণ মানুষ পরম শ্রদ্ধায় স্মরণ করবে।

 

mp-fozle-hossain-badsha2022 new
ওয়ার্কার্স পার্টির পলিট ব্যুরোর সদস্য ও সাধারন সম্পাদক ফজলে হোসেন বাদশা এমপি

 

ভাষা সৈনিক মোশাররফ হোসেন আকুঞ্জি বলেন, বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার মূল আকাঙ্ক্ষা আজও বাস্তবায়িত হয়নি। ফজলে হোসেন বাদশা এখন জাতীয় রাজনীতিক। রাজনীতিতে তার ৫০ বছর; শুধুমাত্র কোন সংখ্যা নয়, একটি সুদীর্ঘ পরিক্রমা। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা চূড়ান্তভাবে বাস্তবায়নের জন্য ফজলে হোসেন বাদশা প্রয়োজনে আরও ৫০ বছর রাজনীতি করবেন। 

 

 

বক্তব্য রাখতে গিয়ে রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের সাবেক মেয়র আব্দুল হাদী বলেন, ছাত্রজীবন থেকেই ফজলে হোসেন বাদশা গণমানুষের অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে রাজনীতি করেছেন। কখনো কৃষক শ্রমিক ও মেহনতি মানুষ, আবার কখনো আদিবাসী, পিছিয়ে পড়া ক্ষুদ্র নিগোষ্ঠীদের নিয়ে লড়াই করেছেন নিরলসভাবে। রাজশাহীর মানুষ হিসেবে তাকে নিয়ে আমরা গর্ববোধ করি।


এক নজরে ফজলে হোসেন বাদশা এমপির জীবনী

 

ফজলে হোসেন বাদশা এমপি রাজশাহীবাসীর কাছে বাদশা ভাই বা বাদশা নামে বেশি পরিচিত। তিনি ১৯৫২ সালের ১৫ অক্টোবর রাজশাহী মহানগরীর হড়গ্রাম বাজারে জন্ম গ্রহণ করেন। তাঁর পিতা খন্দকার আশরাফ হোসেন রাজশাহী  জজ কোর্টের আইনজীবী ছিলেন। মা দিলারা হোসেন। পিতা খন্দকার আশরাফ হোসেন রাজশাহী বার এসোসিয়েশনের সভাপতির দায়িত্ব পালনসহ বিভিন্ন ধরনের সমাজ সেবামূলক ভূমিকা পালন করেন। মা গৃহ পরিচালনার পাশাপাশি নারী উন্নয়নের ক্ষেত্রে সামাজিক দায়িত্বে সচেতন ছিলেন।

 

পরিবারে ৯ ভাই বোনের মধ্যে বাদশা তৃতীয়। তাঁর জন্ম, শৈশব, তারুণ্য, বর্তমান রাজশাহী মহানগরীতেই। বর্ণমালা শেখা শুরু করেন মা ও বোনের কাছে। ১৯৬৭ সালে তিনি রাজশাহী কলেজিয়েট স্কুল থেকে এসএসসি, ১৯৭০ সালে নিউ গভ. ডিগ্রী কলেজ, রাজশাহী থেকে এইচএসসি পাস করেন।  রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি অনার্সসহ অর্থনীতিতে স্নাতকোত্তর ও এলএলবি ডিগ্রী অর্জন করেন।

 

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন বাদশা তুখোড় ছাত্র নেতা হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠেন। শুরু থেকে তিনি প্রগতিশীল বামধারা রাজনৈতিক সংগঠনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। ১৯৬৯ সালে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন (মেনন) এর সদস্য পদ গ্রহণ করেন। এর দু বছর পর মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে বাদশা একজন সংগঠকের ভূমিকা পালন করেন। মুক্তিযুদ্ধের সূচনায় তিনি রাজশাহী মহানগরীর পশ্চিমাঞ্চলে ছাত্র-যুবকদের সংগঠিত করেন। এরপর সক্রিয়ভাবে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়ার উদ্দেশ্যে প্রথমে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের আগরতলা মেলাঘর মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পে যোগদান করেন। 

 

পরে মুর্শিদাবাদ জেলার পানিপিয়া ক্যাম্পে আসেন। মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠিত করার জন্য তিনি কিছুদিন ধুলাউড়া ক্যাম্পেও ছিলেন। দেশ স্বাধীনের পর প্রগতিশীল ছাত্র সমাজকে সংগঠিত করেন ও ছাত্রদের দাবি আদায়ে বেশ সক্রিয় হয়ে ওঠেন। এ জন্য তাঁকে বার বার কারাবরণও করতে হয়। ক্রমশ তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ও রাজশাহী মহানগরীর বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্র-ছাত্রীদের নিকট জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। ফলে ১৯৮০ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (রাকসু) এর ভিপি (ভাইস প্রেসিডেন্ট) নির্বাচিত হন। 

 

ঐ বছরের ৬ ডিসেম্বর  তিনি বাংলাদেশ বিপ্লবী ছাত্র মৈত্রী নামে নতুন একটি ছাত্র সংগঠন নির্মাণে প্রধান ভূমিকা পালন করেন। তিনি সংগঠনটির প্রথম সভাপতি হয়েছিলেন। পরবর্তীতে সংগঠনটির বিপ্লবী শব্দটি বিলুপ্তি করে নামকরণ হয় বাংলাদেশ ছাত্রী মৈত্রী। ছাত্র জীবন শেষের পর যুব সংগঠনের নেতৃত্বে আসেন। তিনিই প্রতিষ্ঠা করেন বাংলাদেশ যুব মৈত্রী নামের নতুন সংগঠন এবং সভাপতি নির্বাচিত হন। ছাত্রদের দাবি আদায়ের পাশাপাশি তাঁকে শ্রমিক নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী হয়ে উঠতে দেখা যায়। ফলে এক সময় রাজশাহী মহানগরীর রিক্সা চালকদের প্রয়োজনের বন্ধু হয়ে ওঠেন। ১৯৭৭ সালে রিকসা শ্রমিকদের অধিকার আদায়ে তাঁদের সংগঠিত করেন। 

 

কৃষি-কারখানার শ্রমিকদের অধিকার আদায়েও বাদশা সহযোগী কর্মীর ভূমিকা পালন করেন।৬২৮  ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী বা আদিবাসীদের সামাজিক জীবনধারার উন্নয়ন এবং তাঁদের প্রতি নির্যাতনের প্রতিবাদে বাদশা সবসময়ই সক্রিয় থেকেছেন। ১৯৯৩ সালে আদিবাসীদের অধিকার আদায়ের উদ্দেশ্যে জাতীয় আদিবাসী পরিষদ গঠনে তিনি মুখ্য ভূমিকা পালন করেন। তিনি ছিলেন এ পরিষদের প্রধান উপদেষ্টা। বরেন্দ্র অঞ্চলে তাঁর প্রচেষ্টায় দুটি আদিবাসী স্কুল স্থাপন হয়।

 

এএইচএম কামারুজ্জান ডিগ্রী কলেজকে সরকারিকরণে তিনি মুখ্য ভূমিকা পালন করেন। এ কলেজের অবকাঠামো উন্নয়নেও ভূমিকা রাখেন। তাঁর প্রচেষ্টাতে রাজশাহী কলেজে পুনরায় উচ্চ মাধ্যমিক শ্রেণি সংযোজিত হয়। ২০১১ সালের ডিসেম্বরে তিনি সরকারি প্রতিনিধি হিসেবে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অংশ গ্রহণ করে বক্তব্য উপস্থাপন করেন। বাদশা রাজনীতির পাশাপাশি শিক্ষা, সংস্কৃতি, ক্রীড়া ক্ষেত্রে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে আসছেন। কিশোর ও তরুণ জীবনে তিনি ভালো ফুটবল খেলোয়াড় ছিলেন। তিনি দিগন্তপ্রসারী সংঘ ও এ্যালাইড ক্লাবের পক্ষে ১ম বিভাগ ফুটবল লীগে খেলতেন। বর্তমানে তিনি দিগন্তপ্রসারী সংঘের স্থায়ী পরিষদের চেয়ারম্যান। 

 

বাদশার সংগ্রাম মুখর রাজনৈতিক জীবন অনেক বারই ঢাকা ও রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারে অন্তরীণ হয়েছে। বন্দী অবস্থাতেও তিনি নির্যাতনের শিকার হন। আবার তাঁকে বন্দীদের অধিকার আদায়ে সোচ্চার হয়ে উঠতে দেখা যায়। একবার রাজশাহীতে কারাবাসের সময় বন্দীদের উপর নির্যাতনের বিরুদ্ধে তিনি আন্দোলন গড়ে তোলেন। ঐ আন্দোলন দমনে গুলি চললে তিন জন বন্দী নিহত হন। এতে আন্দোলন আরো গতিশীল হয়ে উঠে ও এক পর্যায়ে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কারাগারে আসেন। মন্ত্রী বাদশাসহ আন্দোলনরত নেতাদের সঙ্গে আলোচনা সাপেক্ষে বন্দীদের বেশ কিছু দাবি মেনে নেন। তাঁর প্রচেষ্টায় কারা অভ্যন্তরে ঐ তিন মৃত্যুর স্মৃতির স্মরণে একটি শহীদ মিনারও নির্মিত হয়। 

 

১৯৮৩ সালে ঢাকায় সচিবালয় ঘেরাও কর্মসূচিতে নেতৃত্ব দানের কারণে ডিসেম্বরে সামরিক বাহিনী তাঁকে গ্রেফতার করে ক্যান্টনমেন্টে নিয়ে যায়। ক্যান্টনমেন্টে নয় দিন ও নয় রাত তাঁর উপর অমানুষিক নির্যাতন চালানো হয়। বাদশার সহধর্মিণী তসলিমা খাতুন পেশায় কলেজ শিক্ষক। সংসার ও পেশাগত দায়িত্বের পাশাপাশি তসলিমা সমষ্টিগত নারী উন্নয়নের লক্ষ্যে কাজ করে থাকেন। তিনি বাংলাদেশ নারী মুক্তি সংসদের একজন নেত্রী। এ দম্পতি একটি মাত্র সন্তানের জনক-জননী। তাঁদের সন্তানটি কন্যা। নাম ফাহিজা নুযহাত জয়ী। তিনি ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী।।


রাজনীতির ৫০ বছর পূর্তিতে এমপি ফজলে হোসেন বাদশা বলেন, উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা দিয়ে মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছি। বাংলাদেশকে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে দেখতে চাওয়ার আকাঙ্ক্ষাই সেদিন আমাকে মুক্তিযুদ্ধের যাওয়ার জন্য অনুপ্রাণিত করেছিল। আমার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের বিনিময়ে কখনোই কিছু প্রত্যাশা করিনি। চেয়েছি শুধুমাত্র একটি সমতাভিত্তিক ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় প্রতিষ্ঠিত সুখী সমৃদ্ধশালী দেশ। যা এখনো পুরোপুরি ভাবে বাস্তবায়িত হয়নি।


উত্তরবঙ্গ প্রতিদিনের সংবাদটি শেয়ার করুন

Discover more from UttorbongoProtidin.Com 24/7 Bengali and English National Newsportal from Bangladesh.

Subscribe to get the latest posts to your email.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *